নিকোলা টেসলা- কালের রেখায় এক অনন্য নাম

স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন কিংবা টমাস আলভা এডিসনকে আমরা সবাই চিনি, কিন্তু নিকোলা টেসলাকে আমরা কজন চিনি? আর চিনলেও কতটুকু চিনি? সমসাময়িক কিংবদন্তি অন্যান্য বিজ্ঞানীদের তুলনায় অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছেন তিনি। অথচ মেধা মননে নিকোলা টেসলা ছিলেন অনন্য। এক রহস্যময় ঘটনাবহুল জীবন,  দুর্লভ মেধার অধিকারী এই মহান বিজ্ঞানীর জীবন এবং কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছুই জানার রয়েছে।

নিকোলা টেসলার জন্ম হয়েছিলো ১৮৫৬ সালের ১০ জুলাই, সিমিলজান (বর্তমান ক্রোয়েশিয়া) এর একটি গ্রামে। তার জন্মদিন নিয়েও রয়েছে এক অন্যরকম রহস্য। সবার একটিই জন্মদিন হয়, কিন্তু টেসলার  জন্মদিন দুইটি। ১৮৫৬ সালের ৯ জুলাই রাত ১২ টার দিকে তার জন্ম হয় । ভয়ঙ্কর খারাপ আবহাওয়াতে অন্ধকার রাতে জন্ম হয়েছিলো বলে মানুষ তাকে “চাইল্ড অব ডার্কনেস” বলে কটুক্তি করেছিলো কিন্তু তার মা বলেছিলেন আমার ছেলে “চাইল্ড অব লাইট” । সে বড় হয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করবে। সত্যিই টেসলার আবিস্কৃত অল্টারনেটিং কারেন্ট (AC) এখন পর্যন্ত পৃথিবীকে আলোকিত করে রেখেছে।

টেসলার বাবা একজন ধর্মযাজক ছিলেন। বাবার ইচ্ছা ছিলো তিনিও বড় হয়ে একজন ধর্মযাজক হবেন।

১৮৬১ সালে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি  হয়ে তিনি জার্মান ভাষা, গণিত এবং ধর্মতত্ত্ব শেখা শুরু করেন। অসাধারণ মেধার অধিকারী টেসলা স্কুলে পড়া অবস্থাতেই জটিল সব অংকের উত্তর  মুখে মুখে বলে দিতে পারতেন। তখন থেকেই শিক্ষকরা তার মেধার গভীরতা বুঝতে পেরেছিলেন। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকের চার বছরের কোর্স তিনি  তিন বছরেই শেষ করেন।

১৮৭৩ সালে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে কলেরার ভয়ঙ্কর প্রকোপে পরে নয় মাস শয্যাশায়ী থাকার পর সুস্থ হন। বাবা ধর্মযাজক হবার জন্য তাকে আর পিড়াপীড়ি করেননি। ১৮৭৪ সালে আর্মিতে ভর্তি হওয়া থেকে বাঁচতে পালিয়ে যান। বনে-জঙ্গলে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতেন আর বসে বসে মার্ক টোয়েন এর লেখা পরতেন। পরে ১৮৭৫ সালে অস্ট্রিয়ার একটি পলিটেকনিকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান । প্রকৃতপক্ষে এমন কিছুই তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন। পলিটেকনিকে প্রথমবর্ষে তিনি সর্বচ্চ নম্বর পান। সেখানে একজন শিক্ষকের সাথে তার প্রযুক্তিগত কোন একটি বিষয়ে মতভেদ হয়।  ল্যবরেটরিতে দিনে প্রায় ১৮ ঘন্টা করে কাজ করে নিজেকে সঠিক প্রমান করেন। প্রথমদিকে খুব ভাল রেজাল্ট করলেও পরবর্তীতে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পরেন।  ফলস্রুতিতে তাকে এক বছর ড্রপ দিতে হয়েছিলো। পরে একপর্যায়ে একাডেমিক লেখাপড়া ছেরে দেন।

১৮৮১ সালে হাঙ্গেরি চলে যান এবং একটি টেলিগ্রাম কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। সেখানে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কাজ করতেন। সেইসময় তিনি টেলিফোনের এমপ্লিফায়ার এর উন্নতি সাধন করেন, কিন্তু এই কাজের জন্য তিনি কখনো কৃতিত্ব দাবি করেননি। সেখানে অনেকদিন কাজ করার পর তাকে একটি চিঠি দিয়ে অ্যামেরিকায় গিয়ে টমাস আলভা এডিসনের সাথে দেখা করে চিঠিটা দিতে বলা হয়। চিঠিতে লেখা ছিলো “আমি পৃথিবীতে দুজন মহাজ্ঞানী মানুষকে চিনি, যার একজন তুমি , আর অপর জন যে তোমার সামনে দারিয়ে আছেন তিনি” । সময়টি ছিল ১৮৮৪ সাল।

তখন থেকেই টমাস আলভা এডিসনের কোম্পানিতে কাজ করতে শুরু করেন নিকোলা টেসলা। ডিসি জেনারেটরকে পুনরায় ডিজাইন করার কাজ দেয়া হয়েছিল তাকে।  কাজটি করতে পারলে এডিসন তাকে ৫০ হাজার ডলার দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মাসের পর মাস কাজ করে টেসলা সফল হয়েছিলো, কিন্তু এডিসন তার প্রতিশ্রুতি রাখেননি। উলটো বলেছিলেন ” আরে তুমি দেখি রসিকতাও বোঝো না “।পরবর্তীতে, এডিসন টেসলার জন্য সপ্তাহে ১০ ডলার থেকে ১৮ ডলার করে বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। কিন্তু টেসলা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং পদত্যাগ করেন।

টমাস আলভা এডিসনের কোম্পানি ছাড়ার পর ১৮৮৬ সালে রবার্ট লেন এবং বেঞ্জামিন ডালে নামে দু্ইজন ব্যবসায়ির সাথে যোগ দেন। ঐ দুইজন  ব্যবসায়ি তড়িৎ বাল্ব ও কারখানার জন্য আর্থিক সাহায্য করতে সম্মত হয়েছিলেন। আলোর ব্যবহার এর ডিজাইন এর উপর ভিত্তি করে নিকোলা টেসলা প্রথম তড়িৎ বাতি তৈরি করেন এবং তিনি ডাইনামিক যন্ত্রের ডিজাইন করেছিলেন যা ছিল আমেরিকার প্রথম ডিজাইন। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা নিকোলা টেসলার নতুন ধরনের মোটর এবং বাতির প্রতি তেমন আগ্রহ দেখাননি। তারা মনে করেছিল যে, তড়িৎ উন্নয়নের চাইতে অন্য কিছু উন্নয়ন করলে ভাল হবে। তারা টেসলাকে টাকাপয়সা ছাড়াই কোম্পানি থেকে বের করে দিতে চান। টেসলা তার প্রায় সকল ক্ষমতাই হারাতে থাকেন কোম্পানি থেকে। এমন দু:সময়ের মধ্যে পরে যান যে তড়িৎ মেরামত এর কাজ মাত্র ২ ডলার এর বিনিময়ে করতেন।

১৮৮৬ সালের শেষের দিকে টেসলা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন এর নিয়ন্ত্রক আলফ্রেড ব্রাউন এবং নিউইয়র্কের এটর্নি চার্লস এফ পিক এর সাথে যোগাযোগ করেন। সেখানে তিনি চল বিদ্যুৎ বা অল্টারনেটিং কারেন্ট  নিয়ে কাজ শুরু করেন, যা সেই সময়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। অল্টারনেটিং কারেন্টের সুবিধা হল এর মাধ্যমে শুধুমাত্র একটি পাওয়ার স্টেশন দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া যায়, কিন্তু ডিসির সমস্যা হলো ৮০০ মিটার ক্ষেত্রফলের এর মধ্যেই কেবল এটি কাজ করতে পারতো। এদিকে এসি মোটর জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় বিপাকে পরে যায় টমাস আলভা এডিসনের ডিসি মোটর। ১৮৯৩ সালে জর্জ ওয়াশিংটন হাউজ, শিকাগোতে ওয়ার্ল্ড কলম্বিয়ান প্রতিযোগিতায় এসি মোটরের কারণে নিকোলা টেসলা জয়ী হন ।

এসি জনপ্রিয় হলে ডিসি ডিভাইস গুলো বন্ধ হয়ে যাবে তাই এডিসন এর বিরোধিতা করতে শুরু করেন এবং এর নাম দেন ডেথ কারেন্ট। তিনি জীবিত কুকুর, বিড়াল এমনকি হাতি আনিয়ে তাদের টেসলার অল্টারনেটিং কারেন্ট দিয়ে ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে মারেন। যাতে সবাইকে বোঝাতে পারেন এসি  বিপদজনক। কিন্তু তার  প্রচেষ্টা সফল হয়নি, অবশেষে ১৮৯২ সালের মধ্যে নিজের কোম্পানির হেড পদটিও হারান।

১৮৯৪ সালে টেসলা কাজ শুরু করেন অদৃশ্য তরঙ্গ নিয়ে। কিন্তু তার জন্য পেটেন্ট পেটেন্ট বা স্বত্বাধিকার নেননি। উইলিয়াম রন্টজেন সেই তরঙ্গের নাম দেন এক্স-রে। টেসলা বলেন তিনি এটা নিয়ে কাজ করেছিলেন। ১৮৯৫ সালে তার ল্যাবের সবকিছু পুড়ে গিয়েছিলো। তাই এক্স-রের কোন কাজ তিনি দেখাতে পারেননি। তাই আবার নতুন করে শুরু করতে হয় তাকে। টেসলা বলতেন, এই তরঙ্গ ভয়ঙ্কর, এটি যেন মেডিকেলে ব্যাবহার করা না হয়। কিন্তু এতে করে থমাস আলভা এডিসন আরও বেশি করে এক্সরে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তার এক কর্মচারীর উপর এত বেশি ব্যবহার করা হয়েছিলো যে তার হাত কেটে বাদ দিতে হয়েছিলো এবং পরে ক্যান্সারে মারা যায় লোকটি। এডিসন নিজের উপরও এটি প্রয়োগ করেন, যার ফলে তিনি প্রায়ই অন্ধ হতে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন।

বলা হয়ে থাকে রেডিও আবিষ্কারও টেসলাই করেছিলেন। আমরা জানি মার্কনি রেডিও আবিষ্কার করেন। কিন্তু মূলত তিনি টেসলার কন্টেন্টগুলো নিয়েই কাজ করেছিলেন।

১৯৩৫ সালে রবার্ট ওয়াটসন আবিষ্কার করেন রাডার, কিন্তু ১৯১৭ সালেই এর থিউরি দিয়ে যান টেসলা। তিনি এটি করেও দেখাতে পারতেন, কিন্তু সেই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। ইউএস নেভির জন্য তিনি এর প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু তা গ্রহন করা হয়নি, কারন তখন ইউ এস নেভির রিসার্চ এন্ড ডেভলপমেন্ট এর প্রধান ছিলেন এডিসন। ট্রানজিস্টর তৈরির উপকরণ সমূহের পেটেন্ট টেসলারই ছিল। বহির্বিশ্ব থেকে প্রথম রেডিওওয়েভ ধারন করেন টেসলা। এছাড়া তিনি একটি ভুমিকম্প সৃষ্টির যন্ত্র আবিষ্কার করেন, যার ফলে অ্যামেরিকার একটি জায়গায় ভুমিকম্প হয়েছিলো। এমনকি আজকের তারহীন প্রযুক্তিও তারই আবিষ্কার। টেসলা বলেছিলেন, তিনি চাইলে এমন ভুমিকম্প তৈরি করতে পারবেন যা পুরো মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে, এমনকি পুরো পৃথিবীকে দুইভাগে বিভক্ত করে দিতে পারে।

১৮৯৮ সালে তিনি একটি রিমোট চালিত নৌকা আবিষ্কার করেছিলেন, যার মাধ্যমে মূলত তিনি তিনটি আবিষ্কার করেছিলেন, পৃথিবীর প্রথম রিমোট, প্রথম রোবট এবং প্রথম গাইডেড মিসাইল। বলা হয়ে থাকে তার এই অসাধারণ আবিষ্কারের পিছনে স্বামী বিবেকানন্দের অবদান ছিলো অনস্বীকার্য। স্বামী বিবেকানন্দ টেসলাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে তিনি, বেদান্ত, আকাশ এবং জিরো পয়েন্ট ফিল্ড নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছিলেন। যা টেসলাকে আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অনেক প্রভাবিত করেছিল। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তৃতা থেকেও তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন।

১৯২৮ সালে তিনি একটি প্লেন বানান, যা উলম্ব বরাবর উড়তে পারত, এটিই ছিল তার সর্বশেষ পেটেন্ট। টেসলার জীবনের সর্বশেষ ইচ্ছেটি ছিল একটি টাওয়ার বানানো, যা থেকে মানুষ বিনামূল্যে ওয়্যারলেস এনার্জি পাবে। এটি তিনি বানানো শুরুও করেছিলেন, কিন্তু তা বানানোর পর যখন নির্মাতা জানতে পারলেন, এতে করে তার নিজের কোন লাভ নেই তখন তিনি এটি বন্ধ করে দেন।

টেসলা দরিদ্র অবস্থায় মারা যান। দুধ আর বিস্কুট খেয়ে দিন পার হতো তার। শেষ বয়সে তার একটি ইন্টারভিউতে তিনি বলেন, এক আহত কবুতর প্রতিদিন তার কাছে আসতো, সেই কবুতরের জন্য তিনি ২ হাজার ডলার খরচ করে একটি ডিভাইস বানিয়েছিলেন, যাতে করে তাকে পুনরায় সুস্থ করা যায়।

টেসলা ছিলেন একজন অনন্য মেধাবী ব্যাক্তি, তার ছিল ফটোগ্রাফিক মেমোরি, পুরো বই তিনি মুখস্ত বলতে পারতেন, হাজার হাজার ডিজাইন করতে পারতেন মনের মধ্যে। টেসলা দু ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন না, মাঝে মাঝে ঝিমাতেন, যাকে তিনি রিচারজিং এর মতো বলতেন। তার সম্মানে, ম্যাগনেটিক ফ্লাক্স ইন্টেন্সিটির এসআই একক রাখা হয় টেসলা। জুলাই এর ১০ তারিখ নিকোলা টেসলা দিবস পালন করা হয়। কিন্তু সেই সময় তাকে ডাকা হতো পাগল বিজ্ঞানী। হয়তো বা ভুল সময়েই জন্মেছিলেন তিনি। নিকোলা টেসলার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা। 

Facebook Comments

লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য

রাজমনি পাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে (অনার্স) অধ্যায়নরত একজন শিক্ষার্থী।তিনি কিউরিয়াস সেভেনের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক আটিকেল লিখেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 1 =