পদার্থবিজ্ঞানের কিছু অমীমাংসিত রহস্য পর্ব-১

১৯০০ সালে, ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন বলেছিলেন, “এখন পদার্থবিজ্ঞানে আবিষ্কার করবার মতো নতুন কিছু নেই। যা অবশিষ্ট আছে তা হল আরও বেশি যথাযথভাবে পরিমাপ করে দেখা।” তিন দশকের মধ্যে, কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব বিপ্লব ঘটিয়েছে। আজ, কোন পদার্থ বিজ্ঞানী সাহস করে এটা জাহির করবেন না যে, মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সমাপ্তির কাছাকাছি। বিপরীতভাবে, প্রতিটি নতুন আবিষ্কার যেন পদার্থবিজ্ঞানের এক নতুন দিকের উন্মোচন করে, সাথে সাথে পদার্থবিজ্ঞানের অনেক গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়। আজ আমরা পদার্থবিজ্ঞানের সেই সব অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর কিছু জানতে চেষ্টা করবো।

১) ডার্ক এনার্জি আসলে কি?

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কীভাবে সংখ্যা গণনা করেন বা কীভাবে সংখ্যাকে ব্যাবহার করেন তার সাথে মহাবিশ্বের কিছু যায় আসে না। যদিও মহাকর্ষ মহাকাশ-সময়কে অভ্যন্তরীণভাবে আকর্ষণ করছে, মহাবিশ্বের “ফ্যাব্রিক” দ্রুত থেকে দ্রুততর বর্ধিত হচ্ছে। যার জন্য, জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ একটি অদৃশ্য এজেন্ট প্রস্তাব করেছেন যা স্পেস-টাইম বিচ্ছিন্ন করে মাধ্যাকর্ষণকে প্রতিহত করে। তারা এর নাম দিয়েছেন “ডার্ক এনার্জি”। “ডার্ক এনার্জি” এর সব থেকে বেশি গ্রহণযোগ্য মডেলের মধ্যে, এটি একটি “মহাজাগতিক ধ্রুবক”, যা মহাকাশের একটি অন্তর্নিহিত সম্পত্তি, যার “নেতিবাচক চাপ” মহাশূন্যকে পৃথক করছে। মহাশূন্য যত বিস্তৃত হয় তত বেশী মহাশূন্য তৈরি হয় সাথে সাথে তত বেশী ডার্ক এনার্জি তৈরি হয়। সম্প্রসারণের হারের উপর ভিত্তি করে, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে মহাবিশ্বের সমস্ত সামগ্রীর 70 ভাগেরও বেশি ডার্ক এনার্জি দ্বারা গঠিত। কিন্তু কেও জানে না কিভাবে একে খুঁজে পাওয়া যাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেরা গবেষকগণ এই নিয়েই গবেষণা করছেন যে, ডার্ক এনার্জি কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে? যা ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল।

 

 

২) ডার্ক ম্যাটার কি?

স্পষ্টতই, মহাবিশ্বের প্রায় 84 শতাংশ বস্তু আলোকে শোষণ বা নির্গমন করে না। “ডার্ক ম্যাটার”, যাকে বলা হয়, তা সরাসরি দেখা যায় না  এবং এটি এখন পর্যন্ত পরোক্ষভাবে সনাক্তও করা হয় নি। পরিবর্তে, ডার্ক ম্যাটার এর অস্তিত্ব এবং বৈশিষ্ট্যগুলি দৃশ্যমান বস্তু, বিকিরণ এবং মহাবিশ্বের কাঠামোর উপর তার মহাকর্ষীয় প্রভাবগুলির থেকে নির্ণয় করা হয়। এই ছায়াময় পদার্থ ছায়াপথের উপকণ্ঠে ছড়িয়ে পড়া বলে মনে করা হয়, এবং হয়তোবা “উইকলি ইন্টারিএক্টিং মেসিভ পার্টিক্যালস” বা “ডাব্লিউ আই এম পি’স” দ্বারা তৈরি। বিশ্বব্যাপী, ডাব্লুআইএমপিগুলির সন্ধানে বিভিন্ন ডিটেক্টর রয়েছে, তবে এ পর্যন্ত এতে কোনকিছু ধরা পরেনি। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বজুড়ে দীর্ঘ এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে প্রবাহিত হচ্ছে এবং এই ধরণের প্রবাহ হয়তো চুলের মতো পৃথিবী থেকে বিকিরিত হতে পারে।

 

 

৩) কেন সময় সামনের দিকে প্রবাহমান?

সময় কেবল সামনের দিকে প্রবাহমান কারণ মহাবিশ্বের একটি সম্পত্তি যাকে এনট্রপি বলা হয়, খসড়াভাবে যাকে “বিশৃঙ্খলতার পর্যায়” হিসেবে অভিহিত করা যায়, সেটি কেবলমাত্র বাড়তে থাকে এবং এটি ঘটার পর কমানোর বা বিপরীত দিকে যাবার কোন উপায় নেই। এনট্রপি বৃদ্ধি পাচ্ছে এই ব্যাপারটি একটি যুক্তিসংগত ব্যাপার। অর্ডারড এরেজমেন্ট থেকে কণার অনেক ডিসঅর্ডারড এরেজমেন্ট রয়েছে, তাই যখন পদার্থ পরিবর্তিত হয়, তারা বিশৃঙ্খলভাবে ভেঙ্গে পরতে চায়। কিন্তু এখানে অন্তর্নিহিত প্রশ্ন এটি যে, অতিতে এনট্রপি কেন এত কম ছিল? অন্যভাবে বলা যায়, কেন মহাবিশ্ব শুরুর দিকে এত সুশৃঙ্খল বা অর্ডারড ছিল? যখন প্রচুর পরিমাণ শক্তি ছোট আয়তনে আবদ্ধ ছিল।

 

 

৪) মহাবিশ্ব কি সমান্তরাল?

অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল ডাটা আমাদের ধারণা দেয়, স্পেস-টাইম হয়তোবা বাঁকা থেকে সমতল বেশী এবং চিরদিন এভাবেই থাকবে। যদি তাই হয়, তাহলে যে অঞ্চলটি আমরা দেখতে পারি(যাকে আমরা “মহাবিশ্ব” মনে করি) তা হল অসীম বড় মাল্টিভার্সের উপরের স্তরের এক টুকরো মাত্র। একই সাথে, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের তত্ত্বগুলো নির্দেশ করে যে, সেখানে সীমাবদ্ধ সংখ্যক সম্ভাব্য কণার গঠন রয়েছে প্রতিটি মহাজাগতিক টুকরোতে(10 ^ 10 ^ 1২২ স্বতন্ত্র সম্ভাবনা)। সুতরাং, অসীম সংখ্যক মহাজাগতিক টুকরোতে, তাদের মধ্যে কণার গঠন পুনরাবৃত্ত হতে বাধ্য- অনন্তকাল ধরে অনেক বার। এর মানে, সেখানে অসীম সংখ্যক অসংখ্য সমান্তরাল মহাবিশ্ব রয়েছে। মহাজাগতিক টুকরোগুলো, একেবারে আমাদেরটির মতোই(আপনার মতোই কাওকে ধারণ করছে) পাশাপাশি টুকরোগুলো যা একটি কণার অবস্থার জন্য ভিন্ন, এবং তার নিচের টুকরো গুলো আমাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই যুক্তিটিতে কি কোন ভুল রয়েছে? নাকি এটিই উদ্ভট সত্যি? যদি এটি সত্যি হয়, তবে আমরা সমান্তরাল মহাবিশ্বের অস্তিত্ব কিভাবে সনাক্ত করবো?

 

 

৫) কোনটি বেশী, বস্তু নাকি প্রতিবস্তু?

প্রশ্নটি হল, কেন অনেক বেশী বস্তু রয়েছে তার তার বিপরীত আধানে চার্জিত বা বিপরীত স্পিনে ঘূর্ণায়মান, প্রতিবস্তু থেকে? অর্থাৎ মূল প্রশ্নটি হল, কেন কোনকিছু বিদ্যমান থাকে? এক অনুমান থেকে মনে করা হয়, মহাবিশ্ব হয়তো বস্তু এবং প্রতিবস্তুর প্রতি প্রতিসম আচরণ করে এবং তাই বিগ ব্যাং এর সময় সমান সংখ্যক বস্তু এবং প্রতিবস্তু তৈরি হবার কথা। যদি তাই হয়, তাহলে সেখানে তারা উভয়ের সম্পূর্ণ বিনষ্ট হওয়ার কথা। প্রোটন-অ্যান্টিপ্রোটন, ইলেকট্রন-এন্টিইলেকট্রন(পজিট্রন), নিউট্রন-এন্টিনিউট্রন এবং আরও অনেককিছু পরস্পর ধংসপ্রাপ্ত হয়ে যাবে। কিছু কারণে সেখানে বাড়তি কিছু পদার্থ ছিল, যা ধংসপ্রাপ্ত হয়নি। ২০১৫ সালের আগস্টে বস্তু এবং প্রতিবস্তুর মধ্যে পার্থক্যের সবথেকে বিস্তারিত পরীক্ষাটি প্রকাশিত হয়েছে। যা নিশ্চিত করেছে বস্তু এবং প্রতিবস্তু পরস্পরের প্রতিচ্ছবির মতো। কিন্তু তারা কেন একইরকম এই রহস্যের কোন উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি।  

Facebook Comments

লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য

রাজমনি পাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে (অনার্স) অধ্যায়নরত একজন শিক্ষার্থী।তিনি কিউরিয়াস সেভেনের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক আটিকেল লিখেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 55 = 61