কম্পটন ইফেক্ট

কম্পটন ইফেক্ট বা কম্পটন প্রভাব, কম্পটন স্কেটারিং বা কম্পটন বিক্ষেপণ নামেও পরিচিত। ১৯২৩ সালে  Washington University in St. Louis তে বিজ্ঞানী Arthur Holly Compton দ্বারা কম্পটন ইফেক্ট পরিলক্ষিত হয়। সে বছরই তাঁর এক স্নাতক ছাত্র  Y. H. Woo দ্বারা এটি যাচাইকৃত হয়। কম্পটন ইফেক্ট হলো মূলত চার্জড পার্টিকেল দ্বারা ফোটন কণার অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপন, চার্জড পার্টিকেলটি সাধারণত ইলেক্ট্রন থাকে। এর ফলে ফোটন কণার শক্তি হ্রাস পায় এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়। ফোটন কণাটি হতে পারে এক্স রে অথবা গামা রে ফোটন। অর্থাৎ সহজ কথায় মুক্ত ইলেক্ট্রন দ্বারা ফোটন কণার বিক্ষেপণকেই কম্পটন ইফেক্ট বলে। বিজ্ঞানী কম্পটন তাঁর এই আবিষ্কারের জন্য ১৯২৭ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন ।

 

 

ফোটনের শক্তির একটি অংশ রিকয়লিং ইলেক্ট্রনে স্থানান্তরিত হয়। বিপরীত কম্পটন বিক্ষেপণ হয় যেখানে শক্তির কিছু অংশ ফোটনে স্থানান্তরিত হয়। মুক্ত চার্জড পার্টিকেল দ্বারা আলোর অস্থিতিস্থাপক বিক্ষেপনের উদাহরণ হলো কম্পটন বিক্ষেপণ। যেখানে বিক্ষেপিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য আপতিত বিকিরণ থেকে ভিন্ন। কম্পটনের মূল পরীক্ষায়, এক্সরে ফোটনের শক্তি, এটমিক ইলেক্ট্রনের বন্ধন শক্তি থেকে অনেক বড় ছিল, তাই ইলেক্ট্রনগুলোকে মুক্তই ধরা যায়। যে পরিমানে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হয় তাকে কম্পটন শিফট বলে। যদিও নিউক্লিয়ার কম্পটন বিক্ষেপনের অস্তিত্ব বিদ্যমান, সাধারণত কম্পটন ইফেক্ট বলতে এটমের ইলেক্ট্রনসমূহের মধ্যে বিদ্যমান মিথষ্ক্রিয়াকেই বোঝায়। এই প্রভাবটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি প্রমান করে যে আলোকে তরঙ্গ হিসেবে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

চার্জিত কণা দ্বারা বিক্ষেপিত তড়িৎচুম্বকীয় সর্বোৎকৃষ্ট তত্ত্ব, থমসন বিক্ষেপণ, নিম্ন প্রবলতায় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের স্থান পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। সনাতনভাবে আপেক্ষিক গতির চার্জিত কণার ত্বরণ ঘটানোর জন্য, ইলেকট্রিক ফিল্ডের পর্যাপ্ত পরিমান আলোর তীব্রতা বিকিরণ-চাপের পশ্চাদপসরণ ঘটায় অর্থাৎ সরে আসে এবং বিক্ষেপিত আলোর ডপলার স্থান পরিবর্তন ঘটায়, কিন্তু তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্বিশেষে নিম্ন আলোক প্রাবল্যে এই প্রভাবটি অনির্দিষ্টভাবে ছোট হতে পারে। সুতরাং যদি নিম্ন কম্পাঙ্কের কম্পটন বিক্ষেপণ বর্ণনা করতে হয় তবে, আলো এমন আচরণ করে যেন এটি কণা দ্বারা গঠিত। কম্পটনের এক্সপেরিমেন্ট পদার্থবিজ্ঞানীদের নিশ্চিত করে যে, আলো বস্তুর (কোয়ান্টা) মতো কণার প্রবাহ হিসেবে আচরণ করতে পারে, যার শক্তি আলোক তরঙ্গের কম্পাঙ্কের সমানুপাতিক। ইলেক্ট্রন এবং ফোটনের মিথষ্ক্রিয়ার ফলে প্রদত্ত শক্তির কিছু অংশের পশ্চাদপসরণ হচ্ছে, এবং অবশিষ্ট শক্তির ফোটন মূল দিক থেকে সরে গিয়ে অন্যদিকে প্রবাহিত হচ্ছে, তাই এই প্রক্রিয়ার সামগ্রিক ভরবেগ সংরক্ষিত হচ্ছে। যদি বিক্ষেপিত ফোটনের তখনও যথেষ্ট শক্তি থাকে তবে এই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে, তখন ইলেক্ট্রন মুক্ত অথবা ঢিলেঢালাভাবে বিচরণ করে। Compton এবং Simon এর পাশাপাশি Walther Bothe এবং Hans Geiger দ্বারা আলাদা আলাদা কম্পটন বিক্ষেপণ প্রক্রিয়ার ভরবেগ সংরক্ষণের পরীক্ষামূলক প্রতিপাদন, BKS theory (Bohr-Kramers-Slater theory) ভুল প্রমান করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফোটন যদি পর্যাপ্ত পরিমান নিম্ন শক্তিসম্পন্ন হয় তবে চলমান কম্পটন বিক্ষেপনের পরিবর্তে, এটি এর এটম থেকে সম্পূর্ণভাবে ইলেক্ট্রন নিক্ষেপ করতে পারে। উচ্চ শক্তিসম্পন্ন ফোটনসমূহ হয়তোবা নিউক্লিয়াস বর্ষণ করতে সক্ষম এবং একটি ইলেক্ট্রন এবং একটি পজিট্রন তৈরী করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয়  পেয়ার প্রোডাকশন

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, এক্স রশ্মির সাথে বস্তুর মিথস্ক্রিয়ার উপর ভালো গবেষণা চলছিল। দেখা যায় যে, যখন জানা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এক্স রশ্মি এটমের উপর ক্রিয়া করে, এক্স রশ্মি  θ কোণে বিক্ষেপিত হয় এবং θ এর সাথে সম্পর্কিত পরিবর্তিত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উৎপত্তি হয়। যদিও ক্লাসিকাল ইলেক্ট্রোমেগনেটিজম ভবিষ্যৎবাণী করে যে বিক্ষেপিত রশ্মিগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রাথমিক তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সমান হওয়া উচিত। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার মাদ্ধমে জানা গেছে যে, বিক্ষেপিত রশ্মিগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রাথমিক তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকে দীর্ঘ ছিল।

 

১৯২৩ সালে কম্পটন একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন যেখানে তিনি লাইট কোয়ান্টার ভরবেগের মতো কণার মাধ্যমে এক্স রশ্মির স্থান পরিবর্তনের উপর একটি ফিজিক্যাল রিভিউ দেন। ( আইনস্টাইন লাইট কোয়ান্টা প্রস্তাব করেছিলেন ১৯০৫ সালে ফটোইলেক্ট্রিক ইফেক্ট ব্যাখ্যা করার সময়, কিন্তু কম্পটনের ধারণা আইনস্টাইনের কাজের উপর ভিত্তি করে হয়নি)। আলোর কোয়ান্টার শক্তি শুধুমাত্র আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর নির্ভর করে।তার গবেষণাপত্রে, বিক্ষেপিত প্রতিটি এক্সরে ফোটন একটি ইলেক্ট্রনের সাথে ক্রিয়া করে ধরে নিয়ে কম্পটন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের স্থানান্তর এবং এক্স-রশ্মির বিক্ষেপণ কোণের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করেন। উপসংহারে তিনি এই সম্পর্কটি প্রতিপাদন করেন,

λ ′ − λ = h m e c ( 1 − cos ⁡ θ )

যেখানে,

λ= প্রাথমিক তরঙ্গদৈর্ঘ্য

λ ‘= বিক্ষেপিত তরঙ্গদৈর্ঘ্য

h = প্লাংকের ধ্রুবক

m e = ইলেক্ট্রনের বাকি ভর

c = আলোর গতি

   θ = বিক্ষিপ্ত কোণ

h⁄mec কে বলা হয় ইলেক্ট্রনের কম্পটন তরঙ্গদৈর্ঘ্য, এর মান 2.43×10−12 m এর সমান। তরঙ্গদৈর্ঘ্যের স্থানান্তর সর্বনিম্ন ০ (θ = 0° এর জন্য) এবং সর্বোচ্চ ইলেক্ট্রনের কম্পটন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দ্বিগুন (θ = 180° এর জন্য) হতে পারে।

 

Facebook Comments

লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য

রাজমনি পাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে (অনার্স) অধ্যায়নরত একজন শিক্ষার্থী।তিনি কিউরিয়াস সেভেনের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক আটিকেল লিখেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 34 = 42