নতুন ধরণের নিউট্রিনো এর সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা (পর্ব-১)

সম্প্রতি, বিজ্ঞানীরা ফার্মি ন্যাশনাল অ্যাক্সিলারেটর ল্যাবরেটরিতে (বা ফার্মি ল্যাব) গবেষণা করে একটি পরিমাপের কথা উল্লেখ করেছেন, যা সবাইকে হতবুদ্ধি করে দিয়েছে। এতে রয়েছে একটি অতিপারমাণবিক কণা, যাকে নিউট্রিনো বলা হয়। যা ক্ষুদ্র বিশ্বের ভুতের মতো, কারণ এটি সংঘর্ষ ছারাই পৃথিবীতে বিচরণ করতে পারে। এসব জানার আগে আমরা অদ্ভুত কিছু বিষয় সম্পর্কে জেনে নিই।

মিনিবোন” বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় সঞ্চালিত সাম্প্রতিক এক পরিমাপ থেকে একটি নতুন ধরণের নিউট্রিনো আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করা যায়, যা সম্ভবত ডার্ক ম্যাটার এর উৎস। এটি বর্তমানে আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার একটি অন্যতম ধাঁধা। কিন্তু এসবকিছু একসঙ্গে কিভাবে সম্পর্কিত তা বুঝতে হলে আগে নিউট্রিনো এর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে, যা একটি চিত্তাকর্ষক গল্প এবং সেই গল্পে রয়েছে অনেক মোড়।

অস্ট্রেলিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী উলফগ্যং পাউলি, ১৯৩০ সালে সর্বপ্রথম নিউট্রিনো এর অস্তিত্বের কথা প্রস্তাব করেন। আমরা জানি নিউট্রিনো শুধুমাত্র তাদের মধ্যেই সংঘর্ষ করে যারা অকল্পনীয়ভাবে “দুর্বল শক্তি” বা “উইক ফোর্স”। যা সব শক্তির মধ্যে দুর্বলতম এবং যা শুধুমাত্র পরমাণু থেকে ক্ষুদ্রতম এমন দূরত্বের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নিউট্রিনো তৈরি হয়েছে নিউক্লিয়ার রিয়েকশনের মাধ্যমে, পারটিক্যাল এক্সিলারেটরের মধ্যে।

১৯৫৬ সালে আমেরিকান ক্লাইড কোয়ান এবং ফ্রেডরিক রাইনস এর নেতৃত্বে একদল পদার্থবিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো ভৌতিক এক কণা পর্যবেক্ষণ করেন। এই আবিষ্কারের জন্য রাইনস ১৯৯৫ সালে নোবেল পুরস্কার পান(কোয়ান তার আগেই মারা যান)।

কয়েক দশক ধরে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে, সেখানে মূলত তিন ধরণের কণা ছিল, যাদের এখন ফ্লেভার বলা হয়। প্রতিটি নিউট্রিনো ফ্লেভার স্বতন্ত্র। যেমনটি ছোটবেলার ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি, চকলেট বিভিন্ন ফ্লেভারের নেয়াপোলিটান আইসক্রিম। নিউট্রিনো এর আসল ফ্লেভার আসে যখন তারা অন্যান্য অতিপারমানবিক কনার সাথে সংঘবদ্ধ হয়। ইলেকট্রন, মিউন, এবং টাউ এর সাথে যেসব নিউট্রিনো সংযুক্ত থাকে তারা হল যথাক্রমে, ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো, মিউন নিউট্রিনো এবং টাউ নিউট্রিনো। এটমের ভেতরে অবস্থিত ইলেকট্রন অতি পরিচিত, মিউন এবং টাউ হল ইলেকট্রনের গোলগাল এবং অস্থিতিশীল আত্মীয়ের মতো। নিউট্রিনো এর প্রতিটি ফ্লেভারই স্বতন্ত্র এবং এরা কখনই জোরা হয় না বা দেখা যায় না।

১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে, একটি রহস্যের উদ্ভব ঘটেছিলো, এটি ছিল একটি নিউট্রিনোকে ঘিরে। আমেরিকান গবেষক রেমন্ড ডেভিস এবং জন বাহকাল, সবচেয়ে বড় নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরে অর্থাৎ সূর্যে কি হারে নিউট্রিনো(বিশেষত ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো) তৈরি হচ্ছে তা গণনা এবং পরিমাপ করতে চেষ্টা করেছিলেন। যখন অনুমান এবং পরিমাপ তুলনা করা হয়, দেখা যায় ফলাফল ভিন্ন আসছে। তত্ত্ববিদ বাহকাল যত সংখ্যক ইলেকট্রন নিউট্রিনো পাওয়া যাবে বলে অনুমান করেছিলেন তার মাত্র এক তৃতীয়াংশ পেয়েছিলেন পরীক্ষক ডেভিস।

এই বিশেষ পরীক্ষাটি ছিল খুবই আশ্চর্যজনক। ডেভিস একটি কন্টেইনার ব্যাবহার করেছিলেন যা একটি অলিম্পিক সুইমিং পুল এর মতো বড় ছিল এবং নিউট্রিনো সনাক্ত করার জন্য এটি মানসম্পন্ন শুষ্ক পরিষ্কারক তরলে পরিপূর্ণ ছিল। ধারনাটি এমন ছিল যে, সূর্যের নিউট্রিনো যখন ক্লোরিন পরমাণুকে আঘাত করে, শুষ্ক পরিষ্কারক তরলে সেই এটমগুলো আর্গনে পরিণত হয়।ডেভিস কয়েক সপ্তাহের জন্য অপেক্ষা করেন এবং তারপর আর্গন বের করার চেষ্টা করেন। উদাহরণস্বরূপ, সেখানে দেখা গেল তিনি হয়তো ১০ টি আর্গন পাবার কথা চিন্তা করেছিলেন বা ১০ টিই পাবার কথা ছিল কিন্তু তিনি পেলেন মাত্র ৩ টি। পরীক্ষামূলক এই অসুবিধা ছাড়াও বাহকাল যে হিসেবটি করেছিল তা ছিল চ্যালেঞ্জিং এবং সূর্যের মূল তাপমাত্রায় অত্যন্ত সংবেদনশীল। সূর্যের তাপমাত্রার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের কারণে যে পরিমাণ নিউট্রিনো উৎপাদিত হবে বলে ধারণা করা হয়েছিলো সে পরিমাণ হয়নি।

বাহকাল এবং ডেভিস এর মতে,অন্যান্য পরীক্ষাগুলো থেকে পার্থক্যটি বোঝা যায়। তারা যা করার চেষ্টা করেছিলেন তার মধ্যে কি অসুবিধা ছিল? তাদের মধ্যে একজন কি ভুল করেছিলেন? কারণ গণনা এবং পরিমাপ দুটোই ছিল খুব কঠিন। কিন্তু না, তারা উভয়েই একেবারে সঠিক ছিলেন।

আরেকটি অমিল গবেষকদের বিভ্রান্ত করে দেয়। নিউট্রিনোগুলি পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে উৎপাদিত হয় যখন বাইরের স্থান থেকে মহাজাগতিক রশ্মি বায়ুতে সজোরে নিক্ষেপিত হয়, যে বায়ুতে আমরা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে থাকি। বিজ্ঞানীরা খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে জানেন যে যখন এটি ঘটে তখন মিউন এবং ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো 2 থেকে 1 অনুপাতে উৎপাদিত হয়। তবুও, যখন এই নিউট্রিনো পরিমাপ করা হয়, মিউন এবং ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো 1 থেকে 1 অনুপাতে পাওয়া যায়। এবারেও, নিউট্রিনো পদার্থবিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করছে।

সূর্য থেকে এবং মহাকাশ থেকে মহাজাগতিক রশ্মি থেকে নিউট্রিনো এর রহস্য সমাধান করা হয়েছিলো ১৯৯৮ সালে। যখন, মিউন এবং ইলেকট্রন নিউট্রিনো এর অনুপাত নির্ণয় করার জন্য, জাপানের গবেষকরা 50,000 টন পানির বিশাল ভূগর্ভস্থ ট্যাংক ব্যবহার করেছিলেন, এই ট্যাংক এর ঠিক ১২ মাইল উপরে বায়ুমণ্ডলে একই রেসিওতে ৮০০০ মাইল দূরে অপর একটি স্থাপন করেছিলেন। এই চতুর পদ্ধতির কাজে লাগিয়ে তারা দেখেছিল যে ভ্রমণকালে নিউট্রিনো তাদের পরিচয় পরিবর্তন করছে, উদাহরণস্বরূপ, ডেভিস-বাহকাল দেখেন কনড্রুমের মধ্যে, সূর্য থেকে ইলেক্ট্রন নিউট্রিনো অন্য দুটি ফ্লেভারে পরিবর্তিত হচ্ছে [ছবি: বিশ্বের শীর্ষ পদার্থবিজ্ঞান ল্যাবের ভিতরে]।

নিউট্রিনো এর এই ফ্লেভারের পরিবর্তনের ঘটনাটি অনেকটা, ভ্যানিলা এর স্ট্রবেরি বা চকলেটি ফ্লেভারে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার মতো। এই ঘটনাটিকে নিউট্রিনো অসিলেশন বলে। এটি হয় কারণ নিউট্রিনো শুধুমাত্র তাদের পরিচয় পরিবর্তন করে এবং থেমে যায় এমনটি নয়। বরং, যদি তাদের যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়, তবে তিন ধরণের নিউট্রিনো ক্রমাগত তাদের পরিচয় বিনিময় করে বারবার। নিউট্রিনো অসিলেশন এর ব্যাখ্যাটি নিশ্চিত করা হয়েছিল ২001 সালে অন্টারিওতে সুডবারিতে পরিক্ষার মাধ্যমে।

এটি যদি আপনার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়ে থাকে তবে বলতে হয়, আমরা কেবল শুরুর দিকে রয়েছি। বছরের পর বছর ধরে, নিউট্রিনো আরও বিস্ময় তৈরি করেছে, যা আমরা জানবো পরবর্তী লেখায়।

Facebook Comments

লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য

রাজমনি পাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে (অনার্স) অধ্যায়নরত একজন শিক্ষার্থী।তিনি কিউরিয়াস সেভেনের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক আটিকেল লিখেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

81 − = 74