এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি- বিজ্ঞানের আশীর্বাদ

  • এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি কি?

এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপিযার বাংলা হলো বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি হলো এমন একটি যন্ত্র-কৌশল যা ফোটন বা আলোর কণা(যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ইলেক্ট্রোম্যগনেটিক স্পেকট্রাম এর এক্সরে পোরসনে রয়েছে) নির্ণয় এবং পরিমাপ করে। এটা সাধারণত বিজ্ঞানীদের কোন বস্তুর ভৌতিক এবং রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে সাহায্য করে।

বিভিন্ন ধরণের এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি মেথড রয়েছে যা পুরাতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রকৌশলসহ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।কোন উপাদান বা বস্তুর পরিপূর্ণ ছবি তৈরি করতে এই পদ্ধতিটি স্বাধীনভাবে বা একসাথে ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

  • ইতিহাস

উইলহেম কনরাড রোন্টজেন, একজন জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী, ১৯০১ সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন, ১৮৯৫ সালে এক্স-রে আবিষ্কারের জন্য।তার এই নতুন প্রযুক্তি অন্যান্য বিজ্ঞানী এবং চিকিৎসক দ্বারা দ্রুত ব্যবহার করা শুরু হয়।

 

ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী চার্লস বারকলা, ১৯০৬ থেকে ১৯০৮ সালের গবেষণার মাধ্যমে জানতে পারেন যে এক্স রে পদার্থকে চরিত্রগতভাবে পৃথক করতে পারে। তার এই অবদানের জন্য তিনি ১৯১৭ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

 

এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি এর ব্যবহার মূলত তারও আগে শুরু হয়েছিলো, ১৯১২ সালে। যেটি শুরু হয়েছিলো ব্রিটিশ পদার্থবিদ, একটি পিতা-পুত্রের দল, উইলিয়াম হেনরি ব্র্যাগ এবং উইলিয়াম লরেন্স ব্র্যাগ এর সাথে। তারা এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি ব্যবহার করেছিলো কিভাবে এক্সরে বিকিরণ স্ফটিকের মধ্যে পরমাণুগুলোর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে তা জানার জন্য। তাদের এই কৌশলকে  এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি বলা হয়। তারা তাদের এই অবদানের জন্য ১৯১৫ সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন।

 

  • এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি কিভাবে কাজ করে?

যখন একটি পরমানু অস্থিতিশীল থাকে বা উচ্চগতিসম্পন্ন কণার সাথে বর্ষণ করা হয় তখন এর ইলেকট্রনগুলো একটি স্তর থেকে অন্য স্তরে স্থানান্তরিত হয়। ইলেকট্রনগুলো যখন সমন্বিত হয় তখন, উপাদানগুলো উচ্চ শক্তিসম্পন্ন এক্স রে ফোটনগুলোকে শোষণ এবং বিকিরণ করে। এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি শক্তির এই পরিবর্তন পরিমাপ করে। যা বিজ্ঞানীদের পদার্থ শনাক্ত করতে সাহায্য করে এবং বিভিন্ন বস্তুর পরমাণুগুলো কিভাবে পরস্পরের সাথে ক্রিয়া করে তা বুঝতে সাহায্য করে।

সাধারণত দুটি প্রধান এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি কৌশল আছে।

 

১)ওয়েভলেনথ ডিস্পারসিভ এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি(WDXS) এবং

২)এনার্জি ডিস্পারসিভ এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি(EDXS)

WDXS ক্রিস্টাল থেকে বিচ্ছুরিত সিঙ্গেল ওয়েভলেনথ এর এক্সরে পরিমাপ করে। EDXS স্কোপি সেই এক্স রে পরিমাপ করে যা চার্জড পারটিক্যল এর উচ্চ শক্তিসম্পন্ন আধারের ইলেকট্রন থেকে নির্গত। উভয়ক্ষেত্রেই রেডিয়েশন যেভাবে বিচ্ছুরিত হচ্ছে তা পদার্থের পারমাণবিক গঠন নির্দেশ করে।

 

  • বিভিন্ন প্রয়োগক্ষেত্র

বর্তমানে এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি পুরাতত্ত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রকৌশলসহ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নৃতত্ত্ববিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রাচীন শিল্পকর্মের লুকানো তথ্য আবিষ্কার করতে সক্ষম হচ্ছেন,তারা এক্স-রে স্পেকট্রোস্কোপির সাথে বিশ্লেষণ করে তাদের খুঁজে বের করেন।

যেমন, আইরিয়ায় গ্রিনেল কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লি শার্প এবং তার সহকর্মীরা, এক্স-রে ফ্লোরোসেন্স (এক্সআরএফ) স্পেকট্রোস্কপি নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, উত্তর আমেরিকান দক্ষিণ পশ্চিম প্রাগৈতিহাসিক মানুষ দ্বারা তৈরি অবসিডিয়ান এরোহেডস এর উৎপত্তি শনাক্ত করতে। দলটি ২018 সালের অক্টোবরে প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান পত্রিকায় এর ফলাফল প্রকাশ করেছে।

 

এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানীদের মহাশূন্যের বস্তু সম্পর্কে জানতে সাহায্য করেছে। যেমন, সেন্ট লুইসে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কসমিক অবজেক্ট বা মহাজাগতিক বস্তু থেকে নির্গত এক্সরে দেখার পরিকল্পনা করেছেন।

যেমন ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর, তারা এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানার জন্য গবেষণা করছেন। জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী হেনরিক ক্রাকজিনস্কি নেতৃত্বে দল, একটি পরীক্ষামূলক এবং তাত্ত্বিক গবেষণা করছে এমন এক ধরণের এক্সরে স্পেক্ট্রোমিটার বের করার জন্য যার নাম এক্সরে পোলারিমিটার।

 

পেনসিলভানিয়ায় ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটির রসায়নবিদ ও উপকরণ প্রকৌশলী ইউরি গোগোসি, একটি স্প্রে অন এন্টেনাস এবং ওয়াটার ডিসালানেশন মেমব্রেন তৈরি করেছেন এক্সরে স্পেক্ট্রোস্কোপি এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে।

এক্স-রে স্পেক্ট্রোস্কোপি এর ব্যবহার এছাড়াও চিকিৎসা গবেষণা এবং অনুশীলন বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। যেমন আধুনিক সিটি স্ক্যান মেশিনে। এটি সিটি স্ক্যান এর সময় এক্সরে শোষণ বর্ণালী সংগ্রহ করে (ফোটন গণনা বা বর্ণালী সিটি স্ক্যানার মাধ্যমে)। এটি শরীরের ভিতরে কি ঘটছে এই সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য এবং পার্থক্য তুলে ধরতে পারে।

Facebook Comments

লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য

রাজমনি পাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে (অনার্স) অধ্যায়নরত একজন শিক্ষার্থী।তিনি কিউরিয়াস সেভেনের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক আটিকেল লিখেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

55 − = 46