ক্লাসিকাল ফিজিক্সের ভাঙ্গন এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর জন্মের ইতিকথা

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় এমন একটি সময়ের সূচনা হয়েছিল যখন ক্লাসিক্যাল ফিজিক্স বা ফিজিক্সের পুরাতন ধারণা.বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোকে আর ব্যাখ্যা দিতে পারছিলো না। বিজ্ঞানকে আরো যুক্তিযুক্ত ও পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে নতুন ধারণা এবং ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন ধরণের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিলো। ঠিক এই সময় কিছু বিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, ব্যাখ্যা দিয়েছেন নতুন আঙ্গিকে যার ফলশ্রুতিতে জন্ম হয়েছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের।
ঠিক কি কি কারণে এবং কেন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জন্ম হলো এবং ক্লাসিকাল মেকানিক্স কোন কোন জায়গায় ব্যর্থ হলো আজকে আমরা সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

 

১.আল্ট্রাভায়োলেট ক্যাটাস্ট্রফি বা অতিবেগুনী রশ্মির বিপর্যয়-

আল্ট্রাভায়োলেট কেটাস্ট্রফিকে রেলাই–জিন্স ক্যাটাস্ট্রফিও বলা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এটি নিয়ে কিছু ধারণা তৈরী হতে থাকে।

ক্লাসিকাল ফিজিক্স অনুসারে, যখন একটি ব্ল্যাক বডি তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকে তখন এটি সব ফ্রিকুয়েন্সিতেই আলোক বিকিরণ করে। ফ্রিকুয়েন্সি যত বাড়বে আলোক বিকিরণের পরিমাণও ততো বাড়বে। এটা দেখানো যায় যে, “কনসারভেশন অফ এনার্জি” এর নীতিগুলোর বাইরে যেয়ে ব্ল্যাক বডি অসীম পরিমান শক্তি বিকিরণ করতে সক্ষম এবং এর জন্য একটি নতুন ধরণের মডেল নির্দেশ করা প্রয়োজন।

সর্বপ্রথম “আল্ট্রাভায়োলেট কেটাস্ট্রফি” টার্মটি ব্যবহার করেন  পল এহরেনফেস্ট ১৯১১ সালে। কিন্তু এই ধারণাটি তৈরী হয়েছিল ১৯০০ সালে রেলাই-জিন্সের সূত্র থেকে। এটা ইঙ্গিত করে যে, রেলাই-জিন্সের সূত্রগুলো 105 গিগাহার্জের নীচের তেজস্ক্রিয় ফ্রিকোয়েন্সিগুলিতে পরীক্ষামূলক ফলাফলের জন্য সঠিক কিন্তু ইলেক্ট্রোমেগনেটিক বর্ণালীতে পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যখন ফ্রিকোয়েন্সি আল্ট্রাভায়োলেট রিজনে পৌঁছায় তখন এটি কমতে থাকে। আল্ট্রাভায়োলেট ক্যাটাস্ট্রফি পাওয়া যায় স্ট্যাটিসটিকাল মেকানিক্স এর ইকুইপার্সন থিউরিয়াম থেকে, যা থেকে আমরা জানতে পারি, সব হার্মোনিক অসিলেটরের শুণ্যস্থানে গড় শক্তি থাকে (1/2)KT . এখন, ব্ল্যাক বডি থেকে নিঃসৃত রশ্মির ক্লাসিক্যাল এনালাইসিস থেকে আমরা পাই এতে অসিলেটিং ডাইপোল থাকে যা, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা শোষণ এবং নিঃস্সরণ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ব্ল্যাক বডি থেকে নিঃসৃত রশ্মির এনার্জি ডেন্সিটি,

ρ (ν , T ) = 8πkTν2 ⁄ C3 dν

এই ক্ষেত্রে, সমস্যা হলো, এই ক্লাসিকাল সমীকরণ থেকে আমরা জানি, নির্গত তেজস্ক্রিয়তার ফ্রিকোয়েন্সি যতক্ষণ পর্যন্ত কেটাস্ট্রফিতে পৌঁছাতে থাকবে, ততক্ষন পর্যন্ত এনার্জি ডেনসিটি বাড়তে থাকবে। যা পরীক্ষামূলকভাবে দেখা যায় নি। ম্যাক্স প্লাঙ্ক এই সমস্যাটির সমাধান করেন E = hv ব্যবহার করে। যেটি প্ল্যাংকস ল নামে পরিচিত। যেখানে h = ৬.৬২৬*১০^-৩৪ js হলো প্লাঙ্কের ধ্রুবক। এই ধারণাটি এনার্জি ডেনসিটির জন্য একটি অভিব্যক্তি দেয় যেখানে আল্ট্রাভায়োলেট ক্যাটাস্ট্রফিকে গণ্য করা হয় না যার ফলে পরীক্ষামূলক ফলাফলের সাথে একটি ভালো মিল পাওয়া যায়,
ρ ( ν , T ) dν = (8πhν3 ⁄ C3) ⁄ ((e + hν ⁄ KT) – 1)

 

২. এটমের ব্যতিক্রমধর্মী স্থায়িত্ব-

ক্লাসিকাল ফিজিক্স অনুসারে একটি ইলেক্ট্রন যা নিউক্লিয়াসকে অবিরত পরিভ্রমণ করছে তার শক্তি বিকিরণ করতে করতে একসময় নিউক্লিয়াসে পতিত হবার কথা কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। পরীক্ষামূলকভাবে এমন কিছু দেখা যায়নি। কোয়ান্টাম ফিজিক্স অনুসারে বোর এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

৩.ফটো ইলেকট্রিক প্রভাব-

১৮৯০ সালে হেনরিক হার্জ সর্বপ্রথম ফটো ইলেকট্রিক ইফেক্ট পর্যবেক্ষণ করেন, যেখানে আলোকরশ্মি ধাতুর উপর আপতিত হবার পর এর উপরিতল থেকে ইলেক্ট্রন নির্গত হয়। ক্লাসিকাল ফিজিক্স অনুসারে ইলেক্ট্রনের এই নির্গমন প্রবলতার উপর নির্ভর করে। কিন্তু দেখা যায় যে, এটি আপতিত বিকিরণের ফ্রিকোয়েন্সির উপর নির্ভর করে। নিম্ন শক্তি কেন বিকিরিত ইলেক্ট্রনে সঞ্চিত হয় তা ব্যাখ্যা করতেও ক্লাসিকাল ফিজিক্স ব্যর্থ হয়।
আইনস্টাইন প্লাঙ্কের রেডিয়েশন ফর্মুলা E = h v ব্যবহার করে এই সমস্যার সমাধান করেন এবং একটি সূত্র উপস্থাপন করেন,
         h v = h v০ + k E

 

 

৪.কণা – তরঙ্গ দ্বৈততা-

নির্দিষ্ট ভরের একটি চলমান কণা যেমন একটি ভরবেগ প্রাপ্ত হতে পারে ঠিক তেমনই একটি আলোক কণা বা ফোটনও ভরবেগ প্রাপ্ত হতে পারে। আইনস্টাইন এবং প্লাঙ্কের সূত্র থেকে ফোটনের ব্যাখ্যা দেয়া যায়,

E = mc2 = h v = h c ⁄ λ

p = m c = h ⁄ λ

যেখানে, p হলো পার্টিকেল প্যারামিটার এবং h ⁄ λ হলো ওয়েভ প্যারামিটার।
ক্লাসিকাল ফিজিক্স ওয়েভ পার্টিকেল ডিউলিটি বা দ্বৈততা ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়। এটি ব্যাখ্যা দেয় যে, একটি চলমান কণার হয় ওয়েভ থাকবে নয়তো পার্টিকেল প্রপার্টি থাকবে।

৫. সলিড বা কঠিন পদার্থের আপেক্ষিক তাপের ভ্রান্তিজনক সূত্র-

ক্লাসিকাল ফিজিক্সের ইকুইপারশন থিউরিয়াম অনুসারে, অনু বা পরমাণুর প্রতি ডিগ্রি অফ ফ্রিডম এর তার স্পেসিফিক হিটে R ⁄ 2 কান্ট্রিবিউট করা উচিত । যেখানে, R হচ্ছে আইডিয়াল গ্যাস কনস্ট্যান্ট। মূলত, শুধু ট্রান্সলেশনাল এবং কিছু রোটেশনাল ডিগ্রি অফ ফ্রিডম এখানে ভূমিকা রাখে। ভাইব্রেশনাল ডিগ্রি অফ ফ্রিডম এখানে কোনো ভূমিকা রাখে না। তার মানে, প্রতি ডিগ্রি অফ ফ্রিডম এখানে কাজ করছে না । এটিই সলিড বা কঠিন পদার্থের আপেক্ষিক তাপের ভ্রান্তিজনক সূত্র।

 

প্রসঙ্গক্রমে, ক্লাসিকাল ফিজিক্স এর মৌলিক সমস্যাগুলো পরিচিতি এবং গ্রহনযোগ্যতা পায় ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে।

Facebook Comments

লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য

রাজমনি পাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে (অনার্স) অধ্যায়নরত একজন শিক্ষার্থী।তিনি কিউরিয়াস সেভেনের জন্য নিয়মিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক আটিকেল লিখেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 3