ভেজাল মিশ্রিত সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করেই গড়ে উঠেছে আজকের এই বিশাল ইলেকট্রনিক্স সম্রাজ্য

কথায় আছে খাঁটি সোনায় নাকি গয়না হয়না। এ কথাটি যেন ইলেকট্রনিক্সের প্রাণ, সেমিকন্ডাক্টরের ক্ষেত্রেও সম্পর্ণরূপে সত্য। আমরা ইলেকট্রনিক্স এর বিভিন্ন উপকরণ যেমন ডায়োড, ট্রানজিস্টর, এস.সি.আর আই.সি ইত্যাদির সাথে পরিচিত, যা তৈরি করা হয় সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে। বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টর পদার্থকে বলা হয় ইনট্রিনসিক সেমিকন্ডাক্টর। কিন্তু এই ইনট্রিনসিক সেমিকন্ডাক্টর সরাসরি ইলেকট্রনিক্স উপকরনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এক্ষেত্রে ইনট্রিনসিক সেমিকন্ডাক্টরের সাথে কিছু ভেজাল মিশ্রিত করতে হয়। ভেজাল হিসেবে ট্রাইভ্যালেন্ট এটম (যে সকল পরমানুর যোজনী ৩) যেমন বোরন(৫), এ্যলুমিনিয়াম(১৩), গ্যালিয়াম(৩১), ইন্ডিয়াম(৪৯), থেলিয়াম(৮১) এবং প্যান্টাভ্যালেন্ট এটম (যে সকল পরমানুর যোজনী ৫) যেমন আর্সেনিক(৩৩), এন্টিমনি(৫১), বিসমাত(৮৩) ব্যবহার করা হয়। ইনট্রিনসিক সেমিকন্ডাক্টরের সাথে ভেজাল মিশ্রিত করার প্রক্রিয়াকে ডোপিং বলে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন ভেজাল মিশ্রিত করা হয়? বা ডোপিং কেন করা হয়? আমরা জানি যে বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টরের বিদ্যুৎ পরিবহণ ক্ষমতা কন্ডাক্টরের চেয়ে কম এবং ইন্সুলেটরের চেয়ে বেশি। আর এজন্যই নাম হয়েছে সেমিকন্ডাক্টর। কিন্তু মজার ব্যপার হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টরের বিদ্যুৎ পরিবহণ ক্ষমতা পরিবর্তন করা যায় অর্থাৎ সেমিকন্ডাক্টরের বিদ্যুৎ পরিবহণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে কন্ডাক্টরের সমতুল্য করা যায় আবার কমিয়ে ইন্সুলেটরের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করে এ কাজটি করা সম্ভব নয় তাই ডোপিং তথা ভেজাল মিশ্রিত করতে হয়। অমরা ইতোপূর্বে ইলেকট্রন এবং হোল সম্পর্কে জেনেছি। মূলত মুক্ত ইলেকট্রনের চলাচলের মাধ্যমেই কোন পদার্থের মধ্যদিয়ে বিদ্যুৎ পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে হোল হচ্ছে ইলেকট্রনের অভাবজনিত কারণে সৃষ্ট শূণ্যতা বা গর্ত যা ইলেকট্রন প্রবাহের বিপরীত দিকে ধাবিত হয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহের দিক নির্দেশ করে। ইলেকট্রনের চার্জ নেগেটিভ আর হোলের চার্জ পজিটিভ । মূলত ডোপিং এর মাধ্যমে ভেজাল মিশ্রিত করে সেমিকন্ডাক্টরে মুক্ত চার্জের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয় ফলে সেমিকন্ডাক্টরের বিদ্যুৎ পরিবাহিতা বৃদ্ধি পায়। ডোপিং এর মাধ্যমে যদি সেমিকন্ডাক্টরে মুক্ত ইলেকট্রন বা নেগেটিভ চার্জের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয় তাহলে সৃষ্ট সেমিকন্ডাক্টরকে N-type সেমিকন্ডাক্টর বলা হয় অন্যদিকে যদি সেমিকন্ডাক্টরে পজিটিভ চার্জ বা হোলের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয় তাহলে সৃষ্ট সেমিকন্ডাক্টরকে P-type সেমিকন্ডাক্টর বলা হয়।

N-type সেমিকন্ডাক্টর গঠন প্রক্রিয়া:

N-type সেমিকন্ডাক্টর গঠনের জন্য বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টর হিসেবে সিলিকন অথবা জার্মেনিয়াম ব্যবহার করা হয়, অন্যদিকে ভেজাল হিসেবে আর্সেনিক(৩৩), এন্টিমনি(৫১), বিসমাত(৮৩) এদের যে কোনটি নেয়া হয়।
ntype
উপরের ছবিতে একটি N-type সেমিকন্ডাক্টরের গঠন দেখানো হয়েছে। যেখানে বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টর হিসেবে জার্মেনিয়াম এবং ভেজাল দ্রব্য হিসেবে আর্সেনিক ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা জানি যে জার্মেনিয়ামের যোজনী ৪ অর্থাৎ জার্মেনিয়াম পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষপথে ৪ টি ইলেকট্রন রয়েছে। অন্যদিকে আর্সেনিক পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষপথে ৫ টি ইলেকট্রন রয়েছে। N-type সেমিকন্ডাক্টর গঠনে ৪ টি জার্মেনিয়াম পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষপথের ১ টি করে ৪ টি ইলেকট্রন এবং ১ টি আর্সেনিক পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষপথের ৪ টি ইলেকট্রন বন্ধন গঠন করে। কিন্তু আর্সেনিকের ১ টি ইলেকট্রন মুক্ত অবস্থায় থেকে যায়। যে ইলেকট্রনটি পরমাণু থেকে পরমাণুতে স্থানান্তরিত হয়ে বিদ্যুৎ পরিবহণে অংশ গ্রহণ করে। আর এভাবেই N-type সেমিকন্ডাক্টর গঠিত হয়। একটি N-type সেমিকন্ডাক্টরে যতগুলি আর্সেনিক পরমাণু ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত করা হয় ঠিক ততটি মুক্ত ইলেকট্রন তৈরি হয়।

P-type সেমিকন্ডাক্টর গঠন প্রক্রিয়া:

P-type সেমিকন্ডাক্টর গঠনের জন্য বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টর হিসেবে সিলিকন অথবা জার্মেনিয়াম ব্যবহার করা হয়, অন্যদিকে ভেজাল হিসেবে বোরন(৫), এ্যলুমিনিয়াম(১৩), গ্যালিয়াম(৩১), ইন্ডিয়াম(৪৯) এদের যে কোনটি নেয়া হয়।
ptype
উপরের ছবিতে একটি P-type সেমিকন্ডাক্টরের গঠন দেখানো হয়েছে। যেখানে বিশুদ্ধ সেমিকন্ডাক্টর হিসেবে জার্মেনিয়াম এবং ভেজাল দ্রব্য হিসেবে গ্যালিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা জেনেছি যে জার্মেনিয়ামের যোজনী ৪ অর্থাৎ জার্মেনিয়াম পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষপথে ৪ টি ইলেকট্রন রয়েছে। অন্যদিকে গ্যালিয়াম পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষপথে ৩ টি ইলেকট্রন রয়েছে। N-type সেমিকন্ডাক্টর গঠনে এবং ১ টি গ্যালিয়াম পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষপথের ৩ টি ইলেকট্রন ৩ টি জার্মেনিয়াম পরমাণুর সর্ববহিস্থ কক্ষপথের ১ টি করে ৩ টি ইলেকট্রনের সাথে বন্ধন গঠন করে। কিন্তু ১টি জার্মেনিয়াম পরমাণুর ১টি ইলেকট্রনের সাথে বন্ধন গঠনের জন্য একটি যায়গা ফাকা থেকে যায়।এই ফাকা যায়গাই হল হোল। নেগেটিভ চার্জের ঘটতির করণে হোল সৃষ্টি হয় বলে হোল পজিটিভ চার্জ বিশিষ্ট হয়। P-type সেমিকন্ডাক্টরের ক্ষেত্রে এই হোল পরমাণু থেকে পরমাণুতে স্থানান্তরিত হয়ে বিদ্যুৎ পরিবহণে অংশ গ্রহণ করে। আর এভাবেই P-type সেমিকন্ডাক্টর গঠিত হয়। একটি P-type সেমিকন্ডাক্টরে যতগুলি গ্যালিয়াম পরমাণু ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত করা হয় ঠিক ততটি হোল তৈরি হয়।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 55 = 61